ব্লকচেইন কী? পানির মতো সহজ বাংলায় বুঝুন

আমরা যখন ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠাই, তখন সেই লেনদেনের হিসাব কার কাছে থাকে? অবশ্যই ব্যাংকের কাছে। ব্যাংক হলো সেই মধ্যস্থতাকারী, যার ওপর আমরা বিশ্বাস রাখি। কিন্তু ধরুন, এমন একটা ব্যবস্থা আছে যেখানে টাকা পাঠানোর জন্য কোনো ব্যাংক বা তৃতীয় পক্ষের দরকার নেই। আপনার লেনদেনের হিসাব কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জমা থাকবে না, বরং তা ছড়িয়ে থাকবে হাজার হাজার মানুষের কাছে। অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? এই প্রযুক্তির নামই হলো ব্লকচেইন

আজকের এই ব্লগে আমরা ব্লকচেইনের জটিল বিষয়গুলোকে একদম সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করব।

১. ভুল ভাঙান: বিটকয়েন আর ব্লকচেইন এক নয়

অনেকেই মনে করেন বিটকয়েন আর ব্লকচেইন একই জিনিস। আসলে তা নয়। বিটকয়েন হলো এক ধরনের ডিজিটাল টাকা বা কারেন্সি। আর ব্লকচেইন হলো সেই প্রযুক্তি বা সিস্টেম, যার ওপর ভিত্তি করে বিটকয়েন কাজ করে। সহজ কথায়, বিটকয়েন যদি হয় ট্রেন, তবে ব্লকচেইন হলো রেললাইন।

২. ওপেন লেজার বা ‘খোলা খাতা’র ধারণা

ব্লকচেইনের মূল ভিত্তি হলো একটি ‘খোলা খাতা’ বা Open Ledger। ব্যাংকের হিসাবের খাতা যেমন গোপন থাকে, ব্লকচেইনের খাতা ঠিক তার উল্টো, এটি সবার জন্য উন্মুক্ত।

ধরুন, আপনার এলাকায় একটি মুদি দোকান আছে। সেখানে সবাই বাকিতে কেনাকাটা করে। দোকানদার একটি বড় খাতায় সবার হিসাব লিখে রাখেন। এই খাতাটি যদি দোকানের বাইরে সবার দেখার জন্য খোলা রাখা হয়, তবে কেউ কি চাইলেই নিজের ঋণের অঙ্ক বদলে দিতে পারবে? পারবে না, কারণ বাকি সবাই তা দেখে ফেলবে। ব্লকচেইন ঠিক এভাবেই কাজ করে। এখানে লেনদেনের হিসাব কোনো গোপন সার্ভারে নয়, বরং সবার চোখের সামনে থাকে।

৩. লেনদেনের শিকল বা চেইন

‘ব্লকচেইন’ নামটা এসেছে এর কাজের ধরন থেকে। এখানে প্রতিটি লেনদেনের তথ্য একটি ‘ব্লক’ আকারে জমা হয়। এরপর একটি ব্লকের সাথে আরেকটি ব্লক যুক্ত হয়ে একটি দীর্ঘ শিকল বা ‘চেইন’ তৈরি করে।

ধরুন, আপনি আপনার বন্ধুকে ১০০ টাকা পাঠালেন। এই তথ্য একটি ব্লকে জমা হলো। এরপর আপনার বন্ধু সেই টাকা থেকে ৫০ টাকা খরচ করল। এই নতুন তথ্য আগের ব্লকের সাথে যুক্ত হয়ে আরেকটি ব্লক তৈরি করল। এভাবে একটার পর একটা ব্লক যুক্ত হয়ে একটি চেইন তৈরি হয়। এই চেইনের সুবিধা হলো, চাইলেই মাঝখান থেকে কোনো তথ্য মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করা যায় না, কারণ প্রতিটি ব্লক তার আগের ব্লকের সাথে শক্তভাবে যুক্ত থাকে।

৪. বিকেন্দ্রীকরণ: ক্ষমতা সবার হাতে

প্রচলিত ব্যবস্থায় সব তথ্য জমা থাকে একটি কেন্দ্রীয় জায়গায়, যেমন ব্যাংকের সার্ভারে। একে বলা হয় কেন্দ্রীভূত বা Centralised ব্যবস্থা। কিন্তু ব্লকচেইন হলো একটি বিকেন্দ্রীভূত বা Decentralised ব্যবস্থা।

এখানে লেনদেনের হিসাবের খাতাটি নেটওয়ার্কে থাকা প্রতিটি কম্পিউটারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, সবার কাছেই মূল হিসাবের একটি করে কপি থাকে। যদি কোনো হ্যাকার একটি কম্পিউটারের তথ্য বদলে দেয়, তবে বাকি হাজার হাজার কম্পিউটারের তথ্যের সাথে তা মিলবে না এবং সিস্টেমটি সঙ্গে সঙ্গে সেই জালিয়াতি ধরে ফেলবে। এই কারণেই ব্লকচেইন প্রযুক্তি এত নিরাপদ।

সারসংক্ষেপ

সহজ কথায়, ব্লকচেইন হলো এমন একটি প্রযুক্তি যা কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই নিরাপদে তথ্য বা অর্থের লেনদেন করতে দেয়। এখানে বিশ্বাস কোনো ব্যক্তির ওপর নয়, বরং পুরো সিস্টেমের ওপর থাকে, কারণ এই সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ কারও একার হাতে নেই, বরং সবার হাতে ছড়িয়ে আছে।