গিগ অর্থনীতির উত্থান ও টিকে থাকার সমাধান

(এই আর্টিকেলটি আমার “অনলাইন বিজনেস অ্যান্ড ডিজিটাল ক্যারিয়ার” বইটির চতুর্থ অধ্যায়ের একটি অংশ। বইটি কোথায় পাবেন তার বিস্তারিত একদম শেষে দিয়েছি।)

গিগ অর্থনীতির উত্থান ও টিকে থাকার সমাধান

গিগ-ইকোনমি বা গিগ-অর্থনীতি বর্তমান জমানার একটি বিশেষ বাজ-ওয়ার্ড বা গুঞ্জন শব্দ, যা বাংলাদেশে মূলত ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং হিসেবে সবাই চেনে। বলতে পারেন ইন্টারনেট বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করে অর্থ উপার্জনের একটি পন্থা। যেখানে নরমাল চাকুরিজীবীরাও ইন্টারনেট বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে একাধিক আয়ের সংস্থান করতে পারেন। এই ধরনের কাজের সংস্থার কর্মচারী এবং নিয়োগকর্তা উভয়ের জন্য সুবিধা রয়েছে। একজন ফ্রিল্যান্সার নিজেই একজন নিয়োগকর্তা বেছে নিতে পারেন, কাজের পরিমাণ, সময়সূচী এবং কাজের জায়গা নির্ধারণ করতে পারেন। নিয়োগকর্তা উল্লেখযোগ্যভাবে সঞ্চয় করেন কারণ তারা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কাজের জন্য বা কাজের জন্য ব্যাবহৃত সময়গুলির জন্য অর্থ প্রদান করেন, তারা পূর্ণ-সময়ের কর্মচারীদের যেমন স্বাস্থ সেবা, পেনশন ইত্যদি দিতে হয়, তা থেকে মুক্ত থাকেন।

গিগ ইকোনমি কি?

“গিগ ইকোনমি” শব্দটি একটি মুক্ত বাজার ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাগুলি বা কোনো ব্যক্তি বিশেষ, স্বতন্ত্র ঠিকাদার, ফ্রিল্যান্সার এবং স্বল্পমেয়াদী কর্মচারীদের পৃথক কাজ, অ্যাসাইনমেন্ট বা কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য নিয়োগ করে।

কেন এমন নামকরণ?

শব্দটি পারফর্মিং আর্ট ওয়ার্ল্ড থেকে এসেছে যেখানে সঙ্গীতশিল্পী, কৌতুক অভিনেতা ইত্যাদি তাদের ব্যক্তিগত অভিনয়ের জন্য অর্থ প্রদান করা হয়, যাকে “পারফরম্যান্স” হিসাবে উল্লেখ করা হয়। পারফর্মাররা একটি গিগ করেই চলে যেত। এবং তাদের জন্য স্বতন্ত্র ভাবে পে করা হতো। এই স্বল্পমেয়াদী কাজের ট্রেন্ড থেকে গিগ-ইকোনমির জন্ম।

কিভাবে গিগ ইকোনমি বহির্বিশ্বে প্রভাব ফেলছে?

গিগ ইকোনমি হচ্ছে স্বাধীনতার অর্থনীতি। গিগ অর্থনীতির প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন ক্ষেত্রগুলিতে প্রবেশ করিয়েছে, শ্রমবাজার এবং সমাজকে পরিবর্তন করছে একটি নুতন দিগন্তে। আজ পৃথিবীতে ৮ বিলিয়ন মানুষ রয়েছে, তার মধ্যে ৫.৩ বিলিয়ন মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এই অবস্থার অধীনে, ব্যবসা এবং সরকারগুলিকে অবশ্যই ডিজিটাল হতে হবে অথবা তারা অদৃশ্য হয়ে যাবে। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ (এইচবিআর) অনুসারে, ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী গিগ অর্থনীতি ৪৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনজনের একজন আমেরিকান কর্মী ফ্রিল্যান্স কাজের মাধ্যমে তাদের আয়ের কিছু বা পুরোটাই জোগাড় করে নিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অনুমান করে যে ডিজিটাল শ্রম প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা গত এক দশকে পাঁচগুণ বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে ২ মিলিয়ন চাকরি তৈরি হবে, কিন্তু বিলীন হয়ে যাবে ৮.১ মিলিয়ন। এ নিয়ে আমি পরে বলছি যখন আমরা “রোবট কি জব চুরি করছে” সে বিষয়ে জানবো।

মানুষ কেন ঝুঁকছে এই ব্যবস্থায়?

গিগ কর্মীরা দ্রুত বাড়ছে। গিগ অর্থনীতি বিশ্ব দখল করে নিচ্ছে। কে চায় এ থেকে পিছিয়ে পড়তে। বিশেষজ্ঞদেড় মতে গিগ অর্থনীতি (এবং বিশেষ করে উবার এবং এয়ারবিএনবির মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাজ) ঐতিহ্যগত কর্মসংস্থান ব্যাবস্থাকে পরাজিত করবে। তবে এটা ঠিক যে ট্রাডিশনাল কর্মসংস্থান সম্পূর্ণ ভাবে বিলীন হয়ে যাবে না। যাদের দক্ষতা এবং প্রতিভা থাকলেও, সেগুলিকে ভালভাবে কাজে লাগানোর জায়গা পেতো না, তারা এই অর্থনীতিতে সেই সুযোগ গুলো পাচ্ছে। ইন্টারনেটের একসেসের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ পাচ্ছে আয় করার সুবিধা এবং আরো অনেক কিছু যা আমরা এই বইয়ে প্রায় প্রতিটি চাপ্টারেই দেখত পাবো।

গিগ অর্থনীতির সুবিধা ও অসুবিধা

গিগ অর্থনীতির সুবিধাগুলো অন্যতম হচ্ছে, একাধিক কাজের অভিজ্ঞতা করায়ত্ব করা, যতক্ষণ আপনি চান কাজ করতে পারেন। এটি কাজের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। দক্ষতা এবং ইন্টারেস্ট অনুযায়ি উপযুক্ত একটি চাকরি বেছে নিতে পারা যায়। মূল ব্যবসার বা চাকরির বাইরে অতিরিক্ত আয় করা সম্বব। ঘরে বসে যায় করা ইত্যাদি।

অসুবিধার মধ্যে রয়েছে, বেশিরভাগ গিগ কর্মী যারা মোবাইল অ্যাপ বা কম্পিউটার ব্যবহার করে অনলাইনে কাজ করেন তাদের কে অপরিচিতদের সাথে অবিরাম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। গিগ কাজের আয় উপলব্ধ কাজের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে, এবং আপনি যখন কাজটি সম্পূর্ণ করবেন তখনই আপনাকে অর্থ প্রদান করা হবে। সাধারণত, গিগ কর্মীরা স্বাস্থ্য বীমা এবং অবসর পরিকল্পনার জন্য যোগ্য নয়, এবং আপনি যদি চাকরিতে আহত হন, আপনি সাধারণত অক্ষমতা ক্ষতিপূরণ বা বীমা পাবেন না। একটি বৈচিত্র্যময় কাজ আর্থিকভাবে ফলপ্রসূ হতে পারে, তবে এটি স্ট্রেস এবং বার্নআউটও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি একজন ডেলিভারি ড্রাইভার হন, তবে একাধিক কাজ আপনাকে কাবু করে দিতে পারে, প্রভাবিত করতে পারে আপনার জীবনযাত্রার উপর, বিসর্জন দিতে হতে পারে আপনার ফ্যামিলি লাইফ।

গিগ ইকোনমির প্রকারভেদ

বিভিন্ন রকমের গিগ রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম নিচের ৪টি সেক্টর:

অ্যাসেট বা সম্পদ শেয়ারিং সার্ভিস:

এই ধরণের গিগ গুলোতে মানুষ ডিজিটাল প্লাটফমর ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরণের অ্যাসেট ভাড়াদিয়ে থাকে। যেমন হোম, রুম শেয়ারিং। কার শেয়ারিং। নৌকা শেয়ারিং। পার্কিং শেয়ারিং, এমনকি বিভিন্ন ধরণের কাজের সরঞ্জামও শেয়ার করে থাকেন। এতে ব্যাবহৃত প্লাটফর্ম গুলোর অন্যতম: Airbnb, HomeWay, Turo।  

ট্রান্সপোর্ট বেসড সার্ভিসেস:

এগুলো হচ্ছে সেধরণের ডিজিটাল গিগ যেগুলো একটি ফ্রিল্যান্সার ড্রাইভার দিয়ে সম্পন্ন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম, রাইড শেয়ারিং, কার পুলিং, ফুড ডেলিভারি, মুদিখানার জিনিস বিতরণ ইত্যাদি। এতে ব্যাবহৃত প্লাটফর্ম গুলোর অন্যতম: Uber, BlaBlaCar, Doordash, Careem বা আমাদের দেশের পাঠাও রাইড শেয়ারিং।  

প্রফেশনাল সার্ভিসেস:

এই গিগগুলোই মূলতঃ করা হয় সেই সকল ফ্রিল্যাংসিং প্লাটফর্ম ব্যবহার করে যেখানে ফ্রিল্যান্সারদেড় সরাসরি বিজনেসের বা ব্যাক্তিদের সাথে কাজের সুবিধা করে দেয়া হয় প্রজেক্ট করার মাধ্যমে। মাইক্রোওয়ার্ক বা ক্ষুদ্রকাজ, বিজনেস একাউন্টিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, কোডিং, অনুবাদ করার জব ইত্যাদি এর মধ্যে অন্যতম। এতে ব্যাবহৃত প্লাটফর্ম গুলোর অন্যতম: UpWork, Catalan, Guru, Fiverr ইত্যাদি।

বাড়িতে তৈরি পণ্য এবং হাউসহোল্ড সার্ভিসেস:

এই পরিষেবাগুলোর ঘরে বসে কাজ করার কর্মীদের বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পকে বাজারজাত করনের এবং বিক্রিকরণের ব্যবস্থা করে দেয়। এছাড়া টিউশানির, বেবি সিটটিং, হোম নার্সিং সার্ভিস, পোষা প্রাণীদেড় দেখার সেবা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদির সুবিধা দেন করে। এতে ব্যাবহৃত প্লাটফর্ম গুলোর অন্যতম: Care.com, AirTasker, Etsy ইত্যাদি। ইংরেজিতে এটা Handmade Goods, Household and Miscellaneous Services বা HGHM নামে পরিচিত।

গিগ অর্থনীতিতে বাংলাদেশ

গিগ ইকোনমি বা শেয়ারড অর্থনীতির ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাইড শেয়ারিং, ই-কমার্স, অনলাইন মার্কেটপ্লেস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপভিত্তিক নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন দেশের তরুণেরা। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে গিগ অর্থনীতির দিক থেকে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারের বড় একটি গন্তব্য বাংলাদেশ। এ খাতের কর্মী সরবরাহে বাংলাদেশ ১৬ শতাংশ বাজার দখল করে আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখানে মাসে ৬০ মার্কিন ডলার মতো মাসিক আয়। সেখানে গিগ অর্থনীতি বা আউটসোর্সিং আর্থিক স্বাধীনতা ও আয় বাড়ানোর জন্য বড় সুযোগ। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী সে সুযোগ নিচ্ছে।

আমি ব্যাক্তিগতভাবে গিগ অর্থনীতিতে আমাদের তরুণদের যোগ্য করা লক্ষে ফ্রি অনেক ভিডিও টিউটোরিয়াল দিচ্ছি বাংলায় আমার ইউটিউব চ্যানেল (youtube.com/c/digitaldeepdive)।

লিখছি বিভিন্ন ব্লগ পোস্ট (enamulhaque.co.uk/my-blog)

গিগ ইকোনমির ভবিষ্যৎ

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে গিগ অর্থনীতির বুমিং হচ্ছে কারণ বিভিন্ন গিগ ইকোনমি অ্যাপ পরিষেবা শিল্পের মাধমে মানুষের প্রায় প্রতিটি দিককে মোকাবেলা করতে পারছে। করোনভাইরাস মহামারী দ্বারা প্রবর্তিত পরিবর্তনগুলি গিগ অর্থনীতির বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। লোকেরা এখন বাড়িতে থাকে, বাড়ি থেকে কাজ করে এবং তাদের দৈনন্দিন কাজ এবং প্রয়োজনীয়তার জন্য হোম ডেলিভারির পছন্দ করছে। একে বলা হচ্ছে ভবিষ্যতের ইকোনোমিক ব্যাকবোন বা মেরুদন্ড। গিগ অর্থনীতির ভবিষ্যত নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল। ৮৬% ফ্রিল্যান্সাররা বলেছেন যে তারা মনে করেন তাদের শিল্পের জন্য সেরা দিনগুলি এখনও আসেনি, এটা এই ইঙ্গিত দেয় যে অনেকেই আত্মবিশ্বাসী যে গিগ অর্থনীতি বৃদ্ধি পাবে। বিভিন্ন সোর্স থেকে ডেটা এনালাইসিস করলেও একই তথ্য পাওয়া যাবে। গিগ অর্থনীতি এমন কর্মচারীদের জন্য লাভজনক হতে পারে যারা একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদী কাজ চায়, এটা দিন দিন বাড়ছে। গিগ কর্মীদের নিয়োগের দ্বারা বিভিন্ন কোম্পানি তাদের বাসায় বৈচিত্র্য আনতে এবং বিশ্বের যে কোনও জায়গা থেকে উদ্ভাবনী প্রতিভা আনতে সুযোগ পাচ্ছে, এতে কোম্পানিগুলো শুধু লাভবানই হচ্ছে।

এই আর্টিকেলটি আমার “অনলাইন বিজনেস অ্যান্ড ডিজিটাল ক্যারিয়ার” বইটির চতুর্থ অধ্যায়ের একটি অংশ। বইটি পাবেন বাংলাদেশের সর্বত্র।

অনলাইনে: